৫০০ বছর ধরে যে পরিবার মসজিদুল আকসায় আজান দিচ্ছেন

মুসলমানদের পবিত্র এই ঘর ইবাদত করার জন্য সবচেয়ে উত্তম স্থান। ইসলামের তৃতীয় পবিত্রতম মসজিদটি অবস্থিত জেরুজালেমের পুরনো শহরে। এটিই মসজিদুল আকসা নামে পরিচিত। যার কথা আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কোরআনে উল্লেখ করেছেন। বংশ পরম্পরায় পাঁচ শতাব্দীকাল ধরে মসজিদে আকসায় আজান দেয়ার ঐতিহ্য ধরে রেখেছে কাজ্জাজ পরিবার।
বর্তমানে এ পরিবারের অষ্টম পুরুষ ফিরাস আল কাজ্জাজ মসজিদে আকসায় মুয়াজ্জিন হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। প্রতিদিন ফজরসহ তিন সময় তার আজানের ধ্বনি ভেসে আসে মসজিদে আল আকসার মিনার থেকে। সুমধুর কণ্ঠে তার আজান শুনে জেগে ওঠেন পূর্ব জেরুজালেমবাসী।

বাইতুল মুকাদ্দাস তথা মসজিদুল আকসা মুসলমানদের কাছে সব সময় সম্মানিত। রাসূলুল্লাহ (সা.) মিরাজের রাতে মসজিদুল হারাম তথা কাবা শরিফ থেকে মসজিদুল আকসা তথা বাইতুল মুকাদ্দাসে প্রথম সফর করেন, যা ‘ইসরা’ নামে পরিচিত। (সুরা-১৭ ইসরা, আয়াত: ১)। প্রিয় নবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) মিরাজ গমনের সময় এই মসজিদে সব নবী–রাসূলের ইমামতি করে নামাজ আদায় করেন। এর মধ্য দিয়ে তিনি ‘ইমামুল আম্বিয়া’ বা সব নবীর ইমাম ও ‘সাইয়্যিদুল মুরসালিন’ বা সব রাসূলের সরদার হিসেবে স্বীকৃত হন।

এ এলাকা অসংখ্য নবী–রাসূলের স্মৃতিবিজড়িত, এর আশপাশে অনেক নবী–রাসূলের সমাধি রয়েছে। এটি দীর্ঘকালের ওহি অবতরণস্থল, ইসলামের কেন্দ্র এবং ইসলামি সংস্কৃতির চারণভূমি ও ইসলাম প্রচারের লালনক্ষেত্র। এ পবিত্র ভূমির প্রতি ভালোবাসা প্রথিত রয়েছে প্রত্যেক মুমিনের হৃদয়ের গভীরে।

কাবা শরিফ প্রথমে কিবলা থাকলেও মসজিদুল আকসা বা বাইতুল মুকাদ্দাস নির্মাণের পর এটি কিবলা হিসেবে স্বীকৃতি পায়
কাবা শরিফ প্রথমে কিবলা থাকলেও মসজিদুল আকসা বা বাইতুল মুকাদ্দাস নির্মাণের পর এটি কিবলা হিসেবে স্বীকৃতি পায়

সাইয়্যেদিনা ইবরাহিম (আ.) কর্তৃক কাবাঘর নির্মাণের ৪০ বছর পর, তার পুত্র হজরত ইসহাক (আ.)–এর সন্তান হজরত ইয়াকুব (আ.) ফিলিস্তিনের জেরুজালেম নামক স্থানে ‘আল–আকসা’ মসজিদটি নির্মাণ করেন। এরপর তার ছেলে হজরত ইউসুফ (আ.)–এর বংশধর হজরত দাউদ (আ.)–এর সন্তান হজরত সুলাইমান (আ.) তা পুনর্নির্মাণ করেন। তিনি রমজান মাসের শেষ শুক্রবার জেরুজালেম নগর প্রতিষ্ঠা করেন।

কাবা শরিফ প্রথমে কিবলা থাকলেও মসজিদুল আকসা বা বাইতুল মুকাদ্দাস নির্মাণের পর এটি কিবলা হিসেবে স্বীকৃতি পায়। আমাদের প্রিয় নবী (সা.) ওহি লাভ ও নবুয়ত প্রকাশের সময় ‘বাইতুল মুকাদ্দাস’ই কিবলা ছিল। নবীজি (সা.) মদিনায় হিজরতের প্রায় দেড় বছর পর এ কিবলা পরিবর্তন হয়ে আবার ‘কাবা’ কিবলা হিসেবে নির্ধারিত হয়। মদিনা শরিফে মাসজিদু কিবলাতাইন বা দুই কিবলার মসজিদও রয়েছে। ঐতিহাসিক এ ঘটনাকে ‘তাহবিলে কিবলা’ বা কিবলা পরিবর্তন বলা হয়। (সুরা-২ বাকারা, আয়াত: ১৪২-১৫১)।

এ থেকেই ইসলামের দ্বিতীয় কিবলা বাইতুল মুকাদ্দাস মুসলমানদের প্রথম কিবলা হিসেবে পরিচিত হয়। হাদিস শরিফে রয়েছে, ‘কাবা শরিফ তথা মসজিদুল হারামে নামাজে এক লাখ গুণ সওয়াব, মদিনা শরিফে মসজিদে নববিতে নামাজে ৫০ হাজার গুণ সওয়াব, বাইতুল মুকাদ্দাসে নামাজে ২৫ হাজার গুণ সওয়াব।’

ফিরাস আল কাজ্জাজ হচ্ছেন কাজ্জাজ বংশের অষ্টম পুরুষ। ৩২ বছর বয়সী ফিরাস আল আকসা মসজিদের কনিষ্ঠতম মুআজ্জিন। মসজিদে আকসার সন্নিকটে আল সিলসিলা রোডের পাশে তার পরিবারের বসবাস। তবে কয়েক বছর ইহুদিদের আসার সম্প্রসারণ করতে গিয়ে তার ঘরও ভেঙ্গে ফেলা হয়।

৮০ বছর বয়সী বাবার সঙ্গে পালাক্রমে ফিরাস প্রথম দিকে আজান দিতেন। তার বাবাও ৪০ বছর যাবত আল আকসায় আজান দিয়েছেন। এখন ফিরাস ফজর, মাগরিব ও এশার নামাজের আজান দেন। আর ফিরাসের বাবা দিনেরবেলা জোহর ও আসরের সময় আজান দেন। ফিরাস ছোটবেলা থেকেই তার বাবার সঙ্গে মসজিদে আকসায় যেতেন। তখন তার বয়স ১০ বছরও অতিক্রম হয়নি। তখন খুব কাছ থেকেই তিনি আজান শোনার সুযোগ পান।

ফিরাসের পরিবারের মূলত বর্তমান সৌদি আরবের হেজাজের অধিবাসী। ৫০০ বছর আগে তার পূর্ব পুরুষ মসজিদে আকসায় আসেন। সুন্দর কণ্ঠের অধিকারী হওয়ায় উসমানি সম্রাজ্যের দায়িত্বশীলরা তাকে মসজিদে আকসার মুআজ্জিন হিসেবে নিয়োগ দেয়। এরপর থেকে বংশ পরাক্রমায় তারা আজান দিয়ে আসছেন। মূলত জিকির ও ধর্মীয় সঙ্গীত চর্চাই সুফি ধারার এ পরিবারের অন্যতম ঐতিহ্য। তাই পারিবারিক সূত্রে শৈশব থেকে জিকির ও ধর্মীয় আলোচনার মধ্যে তিনি বেড়ে ওঠেছেন।

রাসুলুল্লাহ (সা.) মিরাজের রাতে মসজিদুল হারাম তথা কাবা শরিফ থেকে মসজিদুল আকসা তথা বাইতুল মুকাদ্দাসে প্রথম সফর করেন, যা ‘ইসরা’ নামে পরিচিত। (সুরা-১৭ ইসরা, আয়াত: ১)
রাসুলুল্লাহ (সা.) মিরাজের রাতে মসজিদুল হারাম তথা কাবা শরিফ থেকে মসজিদুল আকসা তথা বাইতুল মুকাদ্দাসে প্রথম সফর করেন, যা ‘ইসরা’ নামে পরিচিত। (সুরা-১৭ ইসরা, আয়াত: ১)

বাবার স্মৃতিচারণ করে ফিরাস বলেন, ‘একদিন বাবা আমাকে পবিত্র কোরআন থেকে তেলাওয়াত করতে বলল। তখন আমার মাত্র ১০ বছর বয়স। তখনই প্রথম নিজের সুন্দর কণ্ঠস্বর উপলব্ধি করি। বাবা আমাকে উৎসাহ দিতে থাকেন। আর আমি তার কাছে শিখতে থাকি।’

১২ বছর বয়সে ফিরাস প্রথম বারের মতো মসজিদে আকসায় আজান দেন। শীতের সময় বরফের চাদরে ঢাকা ছিল জেরুজালেমের পথ-ঘাট ও ঘর-বাড়ি। ফিরাস বলেন, ‘মানুষ আমাকে উৎসাহ দিয়ে সামনে এগিয়ে দেয়। তখন আমার মনে হয়নি যে আমি একটি বিশেষ মসজিদে অবস্থান করছি। বরং মনে হয়েছে আমি সাধারণ কোনো স্থানে আছি। এখন আমি লক্ষাধিক মানুষের সামনেও কোনো ইতস্তবোধ ছাড়াই কোরআন তেলাওয়াত করতে পারি।’

মসজিদে আকসার অতীত-বর্তমান নিয়ে নিজের অনুভূতি ব্যক্ত করে ফিরাস বলেন, ‘আল আকসায় অতীত ও বর্তমানের মধ্যে বিশাল তফাত। আগে এখানে অনেক মাদরাসা ছিল। আরব বিশ্বের অনেক বড় বড় আলেম এখানে আসতেন। ইসলাম ও কোরআন শিক্ষা দিতেন তারা। সুললিত সুরে কোরআন তেলাওয়াতের নানা ধরনের পদ্ধতি শেখাতেন। কিন্তু এখন আর তাঁদের কেউ আসতে পারেন না। ইসরায়েলি সেনারা এ অঞ্চলকে অবরুদ্ধ করে রেখেছে।’

‘আল আকসা প্রান্তরে প্রবেশ করলে আপনার অনুভূতি বদলে যাবে। আমার মনে হয়, এখানের জড় পাথরগুলো আল কুদসের শত-সহস্র বছরের ইতিহাস-ঐতিহ্যের কথা বলছে। আল আকসা মসজিদ আমাদের কাছে যেমন আধ্যাত্মিক স্থান, তেমনি তা রাজনৈতিক ইস্যুও বটে। এখানে এসে মুসলিমরা ইবাদত করবেন। রাসূল (সা.)-এর স্মৃতিবিজরিত এ ভূমি আমাদের কাছে অত্যন্ত আবেগের স্থান।’

ইসরায়েলের দখলদারিত্ব নিয়ে ফিরাস বলেন, ‘আল আকসার অবস্থা এখন বদলে গেছে। এখন আমরা ইহুদিকরণের যুগে প্রবেশ করেছি। তাই আকসায় ঢুকতে আমাদেরকে নানা বিধি-নিষেধ অনুসরণ করতে হয়। কিন্তু সব দুঃখ-কষ্টের পরও আমরা কখনও এ শহর ছেড়ে যাব না।’

ফিরাস বলেন, ‘একবার আমি মালদ্বীপ সফর করি। কিন্তু একদিন না যেতেই আমার আর সেখানে থাকতে মন চায়নি। আমি দ্রুত নিজের শহরে ফিরে আসি। আমি এ শহর ছেড়ে দূরে কোথাও থাকতে পারি না। আমরা পানিতে থাকা মাছের মতো। পানি থেকে বের হলেও মারা যাব। এ পূণ্য ভূমির অনেক মর্যাদা ও বৈশিষ্ট্য আছে। সবচেয়ে বড় সম্মানের বিষয় হলো, এখানে সব নবী-রাসূল নামাজ আদায় করেছেন। এখান থেকে মহানবী মুহাম্মদ (সা.) উর্ধ্বাকাশে মেরাজে গিয়েছেন।’

ফিরাস আল কাজ্জাজ জেরুজালেমের ভোকাল মেলোডিজ ইনস্টিটিউটে দুই বছর আজানের অনুশীলন করেন। এরপর কায়রোর আল আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ে শায়খ মুহাম্মদ আল মিসরির কাছে পড়েন। মূলত আরব বিশ্বে সঙ্গীত চর্চার আগে কোরআন তেলাওয়াতে পারদর্শী হতে হয়।

ফিরাস বলেন, ‘আরব শিল্পীরা পবিত্র কোরআন তেলাওয়াতের মধ্য দিয়ে গান চর্চা শুরু করেন। তাই মিশরের প্রয়াত বিখ্যাত শিল্পী উম্মে কুলসুমও কোরআন পাঠের চর্চা করেছেন। তাছাড়া সিরিয়ার প্রশিদ্ধ শিল্পী সাবাহ ফাখরি প্রথম দিকে একজন মুআজ্জিন ছিলেন।’

‘গান চর্চা করা খুবই সহজ। কিন্তু ছোটবেলা থেকে অত্যন্ত ধার্মিক মুসলিম পরিবারে বেড়ে ওঠেছি যা আমার জীবনে খুবই প্রভাব ফেলেছে। তবে একজন গায়কের জন্য আজান দেয়া অত্যন্ত কঠিন। কারণ এতে নির্দিষ্ট নিয়ম-নীতি অনুসরণ করতে হয় এবং কোরআন সম্পর্কে ভালো জ্ঞান থাকতে হয়। সর্বপরি একজন মুআজ্জিন মানুষকে নামাজের দিকে আহ্বান করেন। আজানের সুমধুর সুর মানুষের অন্তরে গভীর রেখাপাত করে।’

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *