জীবনসঙ্গী যাচাই-বাছাই করব কীভাবে

আমি যদি একজন ছেলে হই তাহলে আমাকে বিয়ে করতে হবে। প্রথমেই দরকার একজন পাত্রীর। তা পাত্রী কেমন হতে হবে? অবশ্যই ঐশ্বরিয়ার মতোন সুন্দরী, মাদার মেরির মতোন চরিত্রবান, আইরিন এডলারের মতন বুদ্ধিমতী, সর্ব কর্মে চৌকস, পশ্চিমা নারীদের মতোন স্মার্ট, দ্রৌপদীর চেয়েও ভালো রাঁধুনি ইত্যাদি হতে হবে। এদিকে আমি কিন্তু নিজে মঞ্জুর চৌধুরী, অতি সাধারণ একজন পুরুষ।

এখন ধরা যাক, আমি মেয়ে। তাহলে আমার পাত্র কেমন হতে হবে? অবশ্যই বিল গেটসের কাছাকাছি ধনী হতে হবে। ওমার বোরকান আল গালার মতোন গুড লুকিং হতে হবে।

যাঁরা ওমার বোরকান আল গালাকে চেনেন না, তাঁদের জ্ঞাতার্থে, ছেলেটি মিডল ইস্টার্ন মডেল। সম্ভবত একমাত্র ব্যক্তি যাঁকে এক অনুষ্ঠান থেকে ডিপোর্ট করা হয়েছে শুধু এই অভিযোগে, সে মেয়েদের মাথা নষ্ট করে দেওয়ার মতোন সুন্দর।

কিংবা লেখাপড়ায় ড. হরদয়াল সিংয়ের মতোন ৩৫টা ডিগ্রি থাকতে হবে, বুদ্ধিতে নিউটন-আইনস্টাইনের উত্তরসূরি হতে হবে, অ্যাপস অবশ্যই এইট প্যাক হতে হবে (সিক্সপ্যাক এখন যে কেউ বানিয়ে ফেলছে), বুড়ো-হাবড়া হলে চলবে না। আবার কোম্পানির আপার মিড লেভেল থেকে টপ লেভেল এমপ্লয়ি হতে হবে। চরিত্র হতে হবে সেই পর্যায়ের। আমি কে? আমি মোসাম্মৎ জরিনা খাতুন।

সমস্যা হচ্ছে, এসব একসঙ্গে একমাত্র বলিউডি ও বাংলা সিনেমা ছাড়া কোথাও পাওয়া যায় না। আপনাকে অবশ্যই অবশ্যই অবশ্যই কোথাও না কোথাও ছাড় দিতেই হবে। আমরা কেউই পারফেক্ট নই। ইম্পারফেকশনের মধ্যেই আমাদের পারফেকশন। কথাটি মাথায় গেঁথে রাখুন।

দেখা যায় অতি রূপবান ছেলেদের হয়তো চরিত্রের দোষ আছে। অতি সুন্দরী নারীর জিহ্বায় সমস্যা আছে। মুখ দিয়ে যা বেরোয়, কলিজা খানখান করে দেয়।

অন্যদিকে, ঘরোয়া পরিবেশে বেড়ে ওঠা অতি সহজ সরল ও সাধারণ দর্শন মেয়েটি হয়তো যার জীবনে যাবে, তাকে ধন্য করে দেওয়ার যোগ্যতা রাখে।

লেখাপড়ায় অতি সাধারণ, চেহারায় অতি সাধারণ, স্কুল-কলেজের বন্ধুবান্ধবের টিটকারির শিকার, গরিব মধ্যবিত্ত পুরুষটি হয়তো তাঁর জীবনসঙ্গিনীর জন্য প্রাণ উজাড় করা ভালোবাসা জমা করে রেখেছেন।

কথা হচ্ছে, আমরা কোন বিষয়কে প্রাধান্য দেব।

ডিল পরিষ্কার—আমি পারফেক্ট মেয়ে এই পৃথিবীতে খুঁজে পাব না। আমাকে কোথাও না কোথাও ছাড় দিতেই হবে। আমাকেই ঠিক করতে হবে আমি কোন গুণটা বেশি করে চাই। কোন দোষটা সামান্য পরিমাণে থাকলেও আমি ইগনোর করতে পারব। সেই অনুযায়ী আমাকে জীবনসঙ্গিনী বেছে নিতে হবে।

টিভিতে মডেলিং করে এমন একজনের রূপ-ফিগারে মুগ্ধ হয়ে উ-লা-লা বলতে বলতে আমি বিয়ে করলাম এবং তারপর আবিষ্কার করলাম তাঁর মডেলিং ক্যারিয়ারটা আমার পছন্দ না। বরং আমি চাই গৃহিণী টাইপ বধূ। তাহলে আমার গালে কষে একটা চড় আমি ডিজার্ভ করি।

দেশে হাজার হাজার, কোটি কোটি গৃহিণী মেয়ে ফেলে রেখে কেন একটা মডেলকে আমি বেছে নিলাম। তারপর জোর জবরদস্তি করে তাঁর মতের বিরুদ্ধে তাঁর ক্যারিয়ারের ওপর হস্তক্ষেপ করতে গেলাম?

ডিসক্লেইমার—যদি কেউ স্বেচ্ছায় পেশা পরিবর্তন করতে চান, তখন ওপরের যুক্তি খাটে না। আমার বউ সাবেক মডেল, এখন পুরোদস্তুর গৃহিণী এবং তার চেয়ে বড় কথা, সে সুখী, তাহলে কারও নাক গলানোর কিছু নেই। আজকের লেখা জোরজবরদস্তির বিরুদ্ধে, স্বেচ্ছা সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে নয়।

কথা প্রসঙ্গে বলে ফেলি, সেদিন বন্ধুদের মধ্যে সানি লিওনি নিয়ে কথা হচ্ছিল। আমি তাঁর সাম্প্রতিক কিছু ইন্টারভিউতে মুগ্ধ হয়ে গেছি। মেয়েটির পারসোনালিটি দারুণ। অন্তত বলিউডের আইটেম গার্ল ও মেইন স্ট্রিম অনেক নায়িকার থেকে ভালো। সবচেয়ে ভালো যা লেগেছে তা হচ্ছে, কারওর নামে কোনো কুৎসা রটানোতে তিনি নেই। এই এক গুণই হাজার হাজার নারী থেকে তাঁকে কয়েক লাখ মাইল ওপরে নিয়ে এসেছে।

তিনি পূর্বজন্মে কী কর্ম করেছে, সেটা থেকে আমার মনে হয় এখন তিনি কী করছেন, সেটাই গুরুত্বপূর্ণ হওয়া উচিত। তিনি এখন আইটেম গানে নাচে। অন্তত পর্নো ছবিতো করছেন না। আশা করি তিনি ভালোর দিকে আরও এগিয়ে আসবেন। আমেরিকায় বহু পর্নো তারকা আছেন যাঁরা অ্যান্টি পর্নো কর্মী হিসেবে অ্যাকটিভ আছেন। অনেক অনেক কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে সেমিনারে নিজেদের মূল্যবান বক্তব্য দিয়ে বেড়ান। তাঁরা তাঁদের অতীত জীবন পরিবর্তন করেছেন। আমরা আমাদের জাজমেন্টাল মেন্টালিটি না হয় পরিবর্তন করি?

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *